গণমানুষের সাথে
পোর্টাল: gonabarta.com | প্রিন্টের সময়: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম
শুধু এমন মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে যেতে চায়, যাদের ভিড়েও সে নিজেকে ভীষণ একা অনুভব করে।
একাকীত্বের শান্তি
কখনো মানুষ একা থাকতে চায় না—
শুধু এমন মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে যেতে চায়, যাদের ভিড়েও সে নিজেকে ভীষণ একা অনুভব করে।
তরিকুলের জীবনটাও ঠিক এমনই ছিল।
রাত গভীর হয়েছে। শহরের ব্যস্ততা থেমে গেছে অনেক আগেই। জানালার বাইরে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। দূরে কোথাও কুকুরের ডাক, মাঝে মাঝে বাতাসের মৃদু শব্দ—এর বাইরে যেন পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।
জানালার পাশে বসে আছে তরিকুল। তার চোখ আকাশের চাঁদের দিকে স্থির।
চাঁদটা আজ খুব সুন্দর।
কিন্তু তরিকুলের মনে হলো, চাঁদটাও বুঝি তার মতোই একা।
একসময় তরিকুল এমন ছিল না।
বন্ধুদের আড্ডা ছাড়া তার দিন কাটত না। হাসি-গান আর গল্পে মাতিয়ে রাখত সবাইকে। তার মুখের হাসি দেখে কেউ কখনো ভাবতেই পারত না—এই হাসির আড়ালে কতটা ক্লান্তি লুকিয়ে আছে।
কিন্তু জীবন সবসময় মানুষের ইচ্ছেমতো চলে না।
একসময় কাছের মানুষগুলোই দূরের হয়ে গেল। যাদের বিশ্বাস করেছিল, তাদের কাছ থেকেই পেল আঘাত। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়েও বারবার শুনতে হলো অবমূল্যায়নের কথা।
ধীরে ধীরে তরিকুলের ভেতরটা ক্লান্ত হয়ে পড়ল।
মানুষের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করত না। ফোনের রিং বিরক্ত লাগত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অসংখ্য মুখের মাঝেও নিজেকে অদ্ভুতভাবে একা মনে হতো।
একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল—
সবকিছু থেকে একটু দূরে যাবে।
কাউকে কিছু না বলে চলে গেল একটি ছোট্ট গ্রামে।
ফোন বন্ধ করল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিল। শহরের কোলাহল, মানুষের ব্যস্ততা আর অপ্রয়োজনীয় সম্পর্ক—সবকিছু পেছনে ফেলে সে নিজেকে নিয়ে থাকতে শুরু করল।
প্রথমদিকে নীরবতাটা খুব কঠিন ছিল।
রাত হলে মনে হতো, চারপাশের এই নীরবতা তাকে আরও বেশি একা করে দিচ্ছে।
কিন্তু কয়েকদিন পর সেই নীরবতাই বদলে গেল।
সকালে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙত।
জানালা খুললেই দেখা যেত সবুজ গাছপালা। দূরে নদী বয়ে যেত আপন মনে। বিকেলে গ্রামের শিশুরা মাঠে খেলত, তাদের হাসির শব্দ বাতাসে ভেসে আসত।
তরিকুল বুঝতে শুরু করল—
নীরবতা সবসময় ভয়ের নয়।
কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে সুন্দর সঙ্গী।
সে বই পড়তে শুরু করল। ডায়েরিতে নিজের কথা লিখত। কখনো নদীর পাড়ে বসে থাকত, কখনো গাছের ছায়ায় শুয়ে আকাশ দেখত।
অনেকদিন পর সে নিজের সঙ্গে কথা বলতে শিখল।
এক রাতে ডায়েরির পাতায় লিখল—
“মানুষের ভিড়ে থেকেও আমি যে একাকীত্ব অনুভব করতাম, তা ছিল কষ্টের। অথচ আজ একা থেকেও আমার মন শান্ত। হয়তো একাকীত্ব শাস্তি নয়—কখনো কখনো এটি নিজের কাছে ফিরে আসার একটি পথ।”
সেদিনের পর তরিকুল আর নিজের একাকীত্বকে ভয় পেল না।
বরং সে বুঝতে পারল, জীবনে সবাইকে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই।
কিছু মানুষ আসে শেখাতে।
কিছু মানুষ আসে বদলে দিতে।
আর কিছু মানুষ চলে যায়—যাতে আমরা নিজের মূল্য বুঝতে শিখি।
এক বিকেলে তরিকুল নদীর ধারে বসেছিল।
সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশে ডুবে যাচ্ছিল। নদীর পানিতে শেষ বিকেলের আলো ঝিকমিক করছিল। বাতাস তার চুল ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
তরিকুল চোখ বন্ধ করল।
তার মনে হলো, এতদিন পর সে সত্যিই শান্ত।
কোনো অভিযোগ নেই।
কোনো অভিমান নেই।
কাউকে কিছু প্রমাণ করার তাড়নাও নেই।
শুধু নিজের সঙ্গে থাকার এক গভীর প্রশান্তি।
সে চোখ খুলে অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক মৃদু হাসি।
তারপর খুব আস্তে বলল—
“মানুষের ভিড় আমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। আর একাকীত্ব আমাকে আবার আমার নিজের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। তাই আজ আমি একাকীত্বকে ভয় পাই না। কারণ একাকীত্বই আমার জীবনের সবচেয়ে অনুপম শান্তি।”
নদী বয়ে চলল।
সূর্য ডুবে গেল।
আর তরিকুল?
সে বসে রইল—নীরবে, শান্তিতে, নিজের মতো করে।
কারণ সে অবশেষে বুঝতে পেরেছে—
সবসময় কারও সঙ্গ পাওয়াই শান্তি নয়।
কখনো কখনো নিজের সঙ্গই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সঙ্গ।
লেখক: এম. এস. তরিকুল ইসলাম (ফারুক মিয়া)