গণমানুষের সাথে
পোর্টাল: gonabarta.com | প্রিন্টের সময়: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
দখল-চাঁদাবাজিতে ব্যবহার হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’, খুঁজে বের করা হবে পৃষ্ঠপোষকদের
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনার পর জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সহিংস ঘটনায় জননিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়ায় কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ও কঠোর অভিযানে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একই সঙ্গে এসব গ্যাং ও অপরাধচক্রের আড়ালে থাকা প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষক ও মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত মঙ্গলবার পুলিশ সদরদপ্তরে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, দেশজুড়ে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, পুলিশ নিয়মিত অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ করে সে অনুযায়ী নিয়মিত গ্রেফতারি অভিযান পরিচালনা করছে।
সাম্প্রতিক সহিংসতা ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব চলতি সপ্তাহে বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী হামলা ও কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরে ‘রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে’ মাস্ক পরিহিত একদল হামলাকারী ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পাশাপাশি মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এবং আদাবরের শ্যামলী হাউজিংয়ের একাধিক ভবনে অস্ত্রধারীরা তাণ্ডব চালায়। এছাড়া ইসিবি চত্বরের কাছে ‘নিউ গিনি প্রপার্টিজ’ হাউজিং প্রজেক্টে ২০০ থেকে ২৫০ জনের একদল সন্ত্রাসী হামলা চালায়।
পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, এসব হামলার অন্তত দুটিতে সরাসরি কিশোর অপরাধীদের সম্পৃক্ততা ছিল। বিশেষ করে রাড্ডা সেন্টারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলা তাণ্ডবে অংশ নেওয়া দেড় শতাধিক হামলাকারীর একটি বড় অংশই ছিল উঠতি বয়সের কিশোর।
এর বাইরে, গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড এবং মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রামে প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় ১৬ বছর বয়সী আরেক কিশোর নিহতের ঘটনায় কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পায়। কুমিল্লায় রোমহর্ষক ওই হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত এলাকায় একটি নতুন কিশোর গ্যাং গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল বলে জানায় পুলিশ।
কিশোর অপরাধ থেকে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড’-এর বর্ধিত রূপ পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, কিশোর গ্যাং এখন আর নিছক গ্যাং বা বিচ্ছিন্ন কোনো দলে সীমাবদ্ধ নেই। তারা এখন সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, জমি দখল, ভাড়াটে লাঠিয়াল এবং বিভিন্ন সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীরা এসব কিশোরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নেতৃত্ব দিচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, অনেক কিশোর গ্যাং এখন বড় অপরাধ জগতের (আন্ডারওয়ার্ল্ড) সহযোগী নেটওয়ার্ক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
পুলিশ সদরদপ্তরে অনুষ্ঠিত আগস্ট মাসের অপরাধ পর্যালোচনা সভায় মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির দেশের সব পুলিশ কর্মকর্তাদের কিশোর অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের আশ্রয়দাতা, মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, “অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় হতে পারে না; তার একমাত্র পরিচয় সে একজন অপরাধী।”
উক্ত সভায় সভাপতিত্বকারী অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সাইদুর রহমান পুলিশকে কিশোর গ্যাং এবং তাদের নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন।
বিশেষজ্ঞদের মত ও সামাজিক বাস্তবতা মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওমর ফারুকের মতে, পূর্বে কিশোররা প্রধানত চুরি বা সাধারণ ক্ষয়ক্ষতির মতো ছোটখাটো অপরাধে লিপ্ত হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রভাবশালীরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এদের ব্যবহার করায় তারা জঘন্য ও সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল কিশোরদের গ্রেফতার করে এই সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়; যারা তাদের সংগঠিত করে ও অর্থায়ন যোগায়, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক জানান, মূলত সুবিধাবঞ্চনা, বেকারত্ব, মাদক এবং তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ কায়েমি স্বার্থ হাসিলের বলি হয়ে কিশোররা এসব গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে। আইনে কিশোরদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের বিধান থাকা প্রয়োজন, কিন্তু যারা এদের মদদ দিচ্ছে, তাদের বিচারে কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়।
অভিযানের চিত্র ও প্রশাসনিক উদ্যোগ গত কয়েক দিনে পুলিশি অভিযানে ব্যাপক সফলতা এসেছে। সম্প্রতি কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও নোয়াখালীতে সন্দেহভাজন ১,৩১০ জনকে আটক করা হয়, যার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৭৩০ জনকে প্রাথমিক সতর্কতায় অভিভাবকদের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়েছে। শুধু কুমিল্লাতেই চার ধাপের বিশেষ অভিযানে ১,৬৭২ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের অপরাধমূলক রেকর্ড খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের একটি অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শহরাঞ্চলে কিশোর গ্যাং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঢাকায় বর্তমানে অন্তত ১২৭টি এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় আরও ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম বিভাগে এদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকে কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে একই সাথে নিশ্চিত করতে হবে যেন কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি এদের কোনোভাবেই ছত্রছায়া বা মদদ দিতে না পারে।